BharatKosha
Back to the archive

कामन्दकीय नीतिसार (आचार्य कामन्दक - प्राचीन भारतीय राजनीति शास्त्र)

Kamandakiya Nitisara with Hindi Commentary

by आचार्य कामन्दक / पं. ज्वालाप्रसाद मिश्र

DevanagariSanskritpublished164 pages

प्रस्तावना एवं नीतिसार मंगलाचरण

Page 1Permalink

The provided image is completely blank and contains no text.

Page 2Permalink

NITISARA BY KAMANDAKA. TRANSLATED BY GANAPATI SARKAR, VIDYARATNA. Author of "Jyotish-Yoga-Tatwa" etc., Editor "Kayastha Patrika," Member, Royal Asiatic Society ; Asiatic Society of Bengal ; Behar and Orissa Research Society ; Life member of Sanskrit Sahitya Parishat, Late Assistant Secretary of Bangiya Sahitya Parishat, Late Joint Secretary of Bangadasiya Kayastha Sava etc. etc. PUBLISHED BY NRIPENDRA KUMAR BASU B.SC.O., M.R.A.S. Nirmala Sahitya Asram—102A, Beliaghata Main Road. B.S. 1331 Saka. 1846 A.D. 1924. All rights reserved. ] [ Price Re 1 only. [ সরকার গ্রন্থমালা ১০ম সংখ্যা ]

Page 3Permalink

প্রধান প্রাপ্তিস্থান :— নির্ম্মলা সাহিত্যাশ্রমে ১০২।এ, বেলেঘাটা মেন রোড, কলিকাতা।

দি ফাইন প্রিন্টিং ওয়ার্কস, প্রিন্টার—শ্রীচণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় : ৩৪৭।১ নং অপার চিৎপুর রোড, কলিকাতা।

Page 4Permalink

কামন্দকীয় নীতিসার শ্রীগণপতি সরকার কৃত অনুবাদ প্রকাশক—শ্রীনৃপেন্দ্রকুমার বসু বি, এস, সি, ও এম, আর, এ, এস, আশ্বিন, ১৩৩১ সাল মূল্য এক টাকা মাত্র।

Page 5Permalink

ভ্রম সংশোধন। অশুদ্ধ শুদ্ধ পঙ্ক্তি পৃষ্ঠা চপল। জীবনকে চপল জীবনকে ১০ ১৯ মিত্রকে মিত্রের ৭ ২১ বান্ধবগণকে বান্ধবগণের স্ত্রীকে স্ত্রীর ৮ ২১ ভৃত্যগণকে ভৃত্যগণের নিকট নিকট এই ব্যবহার ৪ ২৯ মন্ত্ৰনা মন্ত্রণা ১২ ৩২ কি কিন্তু ১৬ ৪৯ মণ্ডল শোধন মণ্ডল চরিত ১৪ ৫৭ সন্ধি সন্ধিমধ্যে ২৬ ৬২ দানযোগ দানযোগ্য ১০ ৯৫ অর্থরও অর্থেরও ২৪ ১০৪ শাস্ত্রজ্ঞান সম্পন্ন শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন ৭ ১০৬

Page 6Permalink

সূচীপত্র বিষয়। পৃষ্ঠা। ইন্দ্রিয়বিজয় ... ... ১—১১ বিদ্যাবিনয়সংযোগ ... ... ১১—১৩ বিদ্যাবিভাগ ... ... ১৩—১৫ বর্ণাশ্রম-ব্যবস্থা ... ... ১৫—১৬ দণ্ড-মাহাত্ম্য ... ... ১৬—১৮ আচার-ব্যবস্থা ... ... ১৮—২২ প্রকৃতি-সম্পৎ ... ... ২২—৩০ অনুজীবিগণের বৃত্তি ... ... ৩০—৩৮ কণ্টক-শোধন ... ... ৩৯—৪০ রাজপুত্র-রক্ষণ ... ... ৪০—৪১ আত্মরক্ষা ... ... ৪১—৪৭ মণ্ডলযোনি ... ... ৪৭—৫২ মণ্ডলচরিত ... ... ৫২—৫৭ সন্ধি-বিকল্প ... ... ৫৮—৬৬ বিগ্রহ-বিকল্প ... ... ৬৬—৭১ যান-আসন-দ্বৈধীভাব-সংশ্রয়-বিকল্প ... ... ৭১—৭৭ মন্ত্র-বিকল্প ... ... ৭৭—৮৪ দূত-প্রচার ... ... ৮৪—৮৭ দূত-চর-বিকল্প ... ... ৮৭—৯০ উৎসাহ-প্রশংসা ... ... ৯০—৯২ প্রকৃতি-কোপ ... ... ৯২—৯৫

Page 7Permalink

৯০ বিষয়। পৃষ্ঠা। প্রকৃতি-ব্যসন ... ... ৯৬—১০০ সপ্তব্যসনবর্গ ... ... ১০০—১০৬ যাত্রা অভিযোগ প্রদর্শন ... ... ১০৭—১১৫ স্কন্ধাবার-নিবেশ ... ... ১১৫—১১৭ নিমিত্ত-জ্ঞান ... ... ১১৭—১১৯ উপায়-বিকল্প ... ... ১১৯—১২৬ সৈন্যবলাবল ... ... ১২৬—১২৯ সেনাপতি-প্রচার ... ... ১২৯—১৩০ প্রয়াণব্যসন-রক্ষণ ... ... ১৩১ কূটযুদ্ধ-বিকল্প ... ... ১৩১—১৩৪ গজ-অশ্ব-রথ-পত্তিকর্ম ... ... ১৩৪—১৩৫ পত্তি-অশ্ব-রথ-গজ-ভূমি কর্ম্ম ... ... ১৩৫—১৩৭ দান-কল্পনা ... ... ১৩৭ ব্যূহ-বিকল্প ... ... ১৩৭—১৪৪ প্রকাশযুদ্ধ ... ... ১৪৪—১৪৫

Page 8Permalink

মুখবন্ধ। শাস্ত্রগ্রন্থের আলোচনা হইতে বুঝিতে পারা যায় যে, দেশ তখনই সুস্থ সবল সুশীল সুসভ্য ও স্বাধীন হয় যখন দেশে ধর্ম্মশিক্ষা ও নীতিশিক্ষা সমান ভাবে চলিতে থাকে। আমাদের দেশের অতীত ও বর্ত্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিলে স্পষ্টই অনুভব হয় যে ভারতবর্ষ তখনই স্বাধীন ও সুখ- সমৃদ্ধিশালী ছিল যখন ভারতে ঐ দুই শিক্ষা প্রবল ছিল। এই শিক্ষা প্রভাবে দেশাত্মবোধ উদ্বুদ্ধ হয় এবং ধর্ম্মে নিষ্ঠা হয়; দেশ সত্য বুঝিতে, সত্যের আদর করিতে, গুণের সম্মান করিতে শিখে; লোক স্বধর্ম্মপরায়ণ স্বজাতিপ্রেমিক এবং আত্মমর্য্যাদাসম্পন্ন হয়, আর দেশ ও ধর্ম্মের জন্য ধন-প্রাণ উৎসর্গ করিতে পারে। আজ আমরা পরাজিত কেন? আজ দেশ দেশ করিয়া এত আন্দোলন করিয়াও অগ্রসর হইতে পারিতেছি না কেন? তাহার মূলে ঐ কথা—আমাদের মধ্যে নীতিশিক্ষা ও ধর্ম্ম-শিক্ষার অভাব ঘটিয়াছে। ঐ দুয়ের অভাবেই আমরা দেশ ও স্বাধীনতা হারাইয়াছি। এখন ঐ দুইটি আয়ত্ব করিতে পারি নাই বলিয়াই আমাদের চেষ্টা ফলবতী হইতেছে না, কোন আন্দোলন স্থিরতালাভ করিতেছে না। ধর্ম্ম নিষ্ঠা দেয় এবং নীতি কার্য্যকুশলতা ও দূরদৃষ্টি প্রদান করে। সুতরাং ঐ দুইটির যুগপৎ সাধনা নিতান্ত আবশ্যক। কেবল ইহার একটি অবলম্বন করিলে সুফল ফলিবে না; একাঙ্গপুষ্টের কার্য্যকারিত্ব কোথায়? উন্নতি কামনা করিলে ধর্ম্ম ও নীতি এই উভয়েরই সমানভাবে সেবা করা প্রয়োজন। ভারতে প্রাচীন সমৃদ্ধি আনিতে হইলে ভারতকে ধর্ম্মবলে ও নীতিবলে বলীয়ান্ হইতেই হইবে। নীতিশাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য, দেশকে স্বাধীন সুসমৃদ্ধ ও সুশৃঙ্খলায় রাখা। হঠাৎ কোন কার্য্যে অগ্রসর হইতে না দেওয়া বা হঠাৎ বিগ্রহে প্রবৃত্ত হইতে না

Page 9Permalink

देओया, इहाइ नीतिर प्रधान कार्य्य। साम दान भेद ओ दण्डके उपयुक्त भावे परिचालना करिबार रीति निर्द्देश कराइ नीतिशास्त्रेर प्रधान उद्देश्य। कोन नीति कि भावे, कोन स्थाने, कि उद्देशे, काहार द्वारा, काहार उपर प्रयोग करिते हइबे एव० कोन समय कोन नीति अवलम्बन करिते हइबे इहाइ नीतिशास्त्र शिक्षा देय। देशके सुशासने राखिया देशेर सुख ओ शान्ति वृद्धि कराइ नीतिर कार्य्य। एइ सकल विवेचना करिया यदि देशेर किछुमात्र कल्याण हय, एइ आशाय धर्मशास्त्र ओ नीतिशास्त्र प्रचारेर यत्किञ्चित् चेष्टा करिते प्रस्तुत हइयाछि। आर देशभाषाय शिक्षा ना हइले शिक्षा शिक्षाइ हय ना, एमन कि शिक्षा एकेबारेइ असम्पूर्ण थाकिया याय, इहा अनुधावन करिया नीतिशास्त्र- गुलिर बाङ्गालाभाषाय अनुवादे प्रवृत्त हइयाछि। एइ कार्य्य अत्यन्त सुकठिन, प्रचुर व्ययसाध्य एव० आमि इहार सम्पूर्ण अनुपयुक्त इहा जानिया ओ क्षुद्र शक्तिते देशमातृकार सेवाय योगदान करिबार जन्य एइ कामन्दकीय- नीतिसारखानिर अनुवाद आमार देशवासीर गोचरे आनिलाम। वर्त्तमाने आमरा कौटिल्येर अर्थशास्त्र, शुक्रनीतिसार ओ कामन्दकीय- नीतिसार एइ तिन खानि श्रेष्ठ नीतिग्रन्थ देखिते पाइ। इहादेर मध्ये एइ कामन्दक पण्डित प्रणीत नीतिसार खानि अन्य दुइ खानि अपेक्षा क्षुद्र हइलेओ अल्पेर मध्ये बेश उपयोगी। अन्यान्य नीतिशास्त्रे राजनीति व्यतीत अन्यान्य अनेक कथाइ रहियाछे, किन्तु इहार विशेषत्व एइटुक्कु ये इहाते केवल राजनीतिर कथाइ आछे; आर इहा एकरूप अर्थशास्त्र अवलम्बने लेखा; सुतरा० याँहारा कौटिल्येर नीतिशास्त्र बुझिते चाहेन, ताँहादेर इहा खूब उपकारे आसिबे। एइ खानि आयत्त करिते पारिले शुक्रनीति ओ चाणक्यनीति आयत्त करा सहज हइबे, एइ भाविया सर्व्व प्रथमे एइखानिर मुद्रण करिलाम। देशेर लोक चाहिेले शुक्रनीति एव० अर्थनीतिओ एइरूपे प्रकाशेर चेष्टा करिब।

Page 10Permalink

কামন্দকীয়-নীতিসারের তিনটি সংস্করণ বাহির হইয়াছে। তিনটিই সংস্কৃত- ভাষায় ; দুই খানি বাঙ্গালা দেশ হইতে ও একখানি ত্রিবাঙ্কুর হইতে প্রকাশিত। ‘এসিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল’ হইতে উপাধ্যায়নিরপেক্ষানুসারিণী টীকার সহিত ৲রাজেন্দ্রলাল মিত্র মহাশয়ের সংস্করণ ও ৲জীবানন্দ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সংস্করণ—এই দুই খানি, এবং জয়মঙ্গলা টীকার সহিত ত্রিবাঙ্কুর হইতে শ্রীযুক্ত গণপতি শাস্ত্রীর সংস্করণ। এই তিনখানির মধ্যে ৲জীবানন্দ বিদ্যাসাগরের সংস্করণ খানি কেবল মূল মাত্র; পুস্তকের মধ্যে যে কলিকাতা সংস্করণের নাম উল্লেখ আছে, তাহা এই সংস্করণ বুঝিতে হইবে। এই সংস্করণে উনিশটি সর্গ আর ত্রিবাঙ্কুর সংস্করণে বিশটি সর্গ দেখা যায়; কিন্তু উনিশ বা বিশ সর্গে কোন প্রভেদ নাই। কলিকাতা সংস্করণের একাদশ সর্গকে ভাঙ্গিয়া ত্রিবাঙ্কুর সংস্করণে দুইটি সর্গ করায় একটি সর্গ বাড়িয়া গিয়াছে। তবে এখানে অনেকগুলি অতিরিক্ত শ্লোক ত্রিবাঙ্কুর সংস্করণে আছে যাহা কলিকাতা সংস্করণে নাই। ইহা ব্যতীত অনেক স্থানে উভয় সংস্করণে কোথাও শ্লোকের কম বেশী হইয়াছে এবং পাঠ লইয়াও প্রভেদ ঘটিয়াছে, সেগুলি পুস্তক মধ্যে সেই সেই স্থানে পাদটীকায় উল্লেখ করা হইয়াছে। আর উল্লেখিত টীকাকার ও ব্যাখ্যাকার বলিতে জয়মঙ্গলা টীকাকার বুঝিতে হইবে। প্রথমে ইচ্ছা ছিল যে কলিকাতা সংস্করণ অনুসারেই এই পুস্তক মুদ্রিত করিতে হইবে। তদনুসারে দশম-সর্গ পর্যন্ত সর্গ ও শ্লোক সংখ্যা দেওয়া হয়; কিন্তু একাদশ-সর্গ হইতে সর্গ ও শ্লোকের গোলযোগ এবং সর্ব্বাপেক্ষা অশুদ্ধতার জন্য বাধ্য হইয়া এই একাদশ-সর্গ হইতে শেষ পর্যন্ত ত্রিবাঙ্কুর সংস্করণ অনুসরণ করিতে হইয়াছে। দেশ পরাধীন হওয়ায়, যুদ্ধবিদ্যার চর্চ্চা আমাদের মধ্যে লোপ পাইয়াছে; সুতরাং ব্যূহ সমাবেশ সকলে সহজে বুঝিতে না পারিতে পারেন, এই আশঙ্কায় পরিশিষ্টে ব্যূহের চিত্র দেওয়া হইল। এই পুস্তকের প্রথম ও দ্বিতীয় সর্গের অনুবাদে পণ্ডিত শ্রীযুক্ত রামকৃষ্ণ

Page 11Permalink

১০ তপস্বী বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের যথেষ্ট সাহায্য পাইয়াছি। আর সাহায্য পাইয়াছি পণ্ডিত শ্রীযুক্ত আশুতোষ তর্কতীর্থ মহাশয়ের—তিনি পুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত হইতে প্রুফ দেখা পর্যন্ত কার্য্য করিয়াছেন এবং সর্ব্বদাই পরামর্শ দিয়াছেন, তাঁহার এইরূপ সাহায্য না পাইলে আমি একার্য্য করিয়া উঠিতে পারিতাম কি না সন্দেহ। এজন্য আমি এই উভয়ের নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ। আমার বলিবার কিছুই নাই। নীতিশাস্ত্র আমরা ভুলিয়া গিয়াছি। এ অবস্থায় অনুবাদে যদি কোথাও কিছু ত্রুটি থাকে তাহা অনুগ্রহ করিয়া আমাকে দেখাইয়া দিলে নিতান্ত বাধিত হইব। ৬৯নং বেলেঘাটা মেন্ রোড্,
কলিকাতা। আশ্বিন ১৩৩১ সাল } শ্রীগণপতি সরকার।

Page 12Permalink

কামন্দকীয় নীতিসার। প্রথম সর্গ। ইন্দ্রিয় বিজয়। যাহার প্রতাপে জগৎ সনাতন ধর্ম্মপথে অবস্থান করিয়া থাকে, সেই শ্রীমান্—ঐশ্বর্য্যসম্পন্ন, দণ্ডধারী ভূপতির জয় হউক। ইহার তাৎপর্য্য এই, —অষ্টদিকপালের অংশে অবতীর্ণ প্রজাপালক রাজা শাসনদণ্ড গ্রহণ করিয়া রাজ্যশাসন না করিলে—দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন না করিলে—রাজ্য মধ্যে ভীষণ অরাজকতা এবং প্রবল অত্যাচার ও বিশৃঙ্খলা ঘটিত; সনাতনধর্ম্ম বিচ্ছিন্ন হইত; ধর্ম্ম-কর্ম্মের অনুষ্ঠান লোপ পাইত; নিরীহ প্রজাবর্গের ধনপ্রাণ সর্ব্বদাই আতঙ্কে পূর্ণ থাকিত; এই কারণে প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রজাপালক দণ্ডধর রাজার সৃষ্টি করিয়াছেন। যমদণ্ডের ন্যায় ভীষণ রাজদণ্ডের ভয়ে কেহই উচ্ছৃঙ্খল ও উন্মার্গগামী হইতে পারে না। এইরূপ প্রতাপশালী, ঐশ্বর্য্য-সম্পন্ন এবং দণ্ডধর ভূপতির সর্ব্বাতিশায়ী উৎকর্ষ কামনা সর্ব্বথা যুক্তিসঙ্গত ॥১॥ ঋষিগণের বিশালবংশের ন্যায় প্রচুরতর অপ্রতিগ্রাহকদিগের বংশে যিনি ভূতলে বিখ্যাত হইয়াছিলেন, যিনি অগ্নিতুল্য তেজস্বী, বেদজ্ঞগণের অগ্রগণ্য, যিনি বুদ্ধির প্রাচুর্য্যে সকল বিষয়ে সুনিপুণ এবং যিনি চারিখানি বেদকে একখানি বেদের ন্যায় অনায়াসে ও সহজে অধ্যয়ন করিয়াছিলেন; ইন্দ্র যেমন বজ্র দ্বারা পক্ষযুক্ত পর্ব্বতের সমূলে উচ্ছেদ করিয়াছিলেন,

Page 13Permalink

২ কামন্দকীয় নীতিসার। সেইরূপ বজ্রানলতুল্য তেজঃসম্পন্ন যাহার অভিচার—(মারণ উচ্চাটনাদি) রূপ বজ্র উত্তম উৎসবক্রিয়াসম্পন্ন ঐশ্বর্য্যশালী নন্দরূপ পৰ্ব্বত সমূলে উৎপাটত করিয়াছিল; যিনি শক্তিদ্বারা শক্তিধর কার্ত্তিকেয়ের তুল্য এবং একাকী বা অসহায় হইয়া মন্ত্রশক্তিপ্রভাবে নৃপশ্রেষ্ঠ চন্দ্রগুপ্তের নিমিত্ত মেদিনী আহরণ করিয়াছিলেন অর্থাৎ যিনি নন্দবংশ ধ্বংস করিয়া চন্দ্রগুপ্তকে মগধের রাজা করিয়াছিলেন; আর যিনি ধীশক্তি-সম্পন্ন হইয়া অর্থশাস্ত্ররূপ মহাসমুদ্র হইতে নীতিশাস্ত্ররূপ অমৃত উদ্ধৃত করিয়াছিলেন, আমি সেই বিধাতার তুল্য অতুলশক্তিশালী সুধীবর বিষ্ণুগুপ্তকে ( চাণক্যকে ) নমস্কার করি ॥২—৬॥ সমস্ত বিদ্যার পারদর্শী মহামতি বিষ্ণুশর্মার সুদৃষ্টিতে পতিত হইয়া, রাজনীতিশাস্ত্রের জটিলতা ও অপ্রিয়তা দূরীভূত হইয়া, অর্থবিশিষ্ট অথচ একখানি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ বলিয়া পরিচিত হইয়াছে ॥৭॥ কিরূপে বিপক্ষবর্গ বিদলিত করিয়া পৃথিবী জয় করিতে হয় এবং কিরূপেই বা জয়লব্ধ-পৃথিবীর পালন করিতে হয়, তদ্বিষয়ে প্রাচীন রাজনীতিজ্ঞ পণ্ডিতগণের মতানুসারেই সংক্ষেপে রাজনীতির বিষয় প্রকাশ করিব ॥৮॥ পূর্ণচন্দ্রের উদয়ে সমুদ্রের যেরূপ জলস্ফীতি হইয়া থাকে, সেইরূপ প্রজাগণের নয়নাবিরাম ভূপতিও এই জগতের বৃদ্ধির বা অভ্যুদয়ের কারণ হন, ইহা প্রাচীন পণ্ডিতগণের অভিমত। ইহার তাৎপর্য্য এই যে, রাজা শাসনদণ্ড পরিচালন করেন বলিয়া জগতে বিশৃঙ্খলা ঘটিতে পারে না, তাহাতে প্রজাবর্গের সর্ব্বাঙ্গীন কুশল হয় ॥৯॥ যদি নরপতি সম্পূর্ণ নেতৃত্ব গ্রহণ না করিতেন, তাহা হইলে প্রজাবর্গ সমুদ্রে কর্ণধারবিহীন তরণীর ন্যায় এই সংসারে রক্ষকবিহীন হইয়া পদে পদে বিপদাপন্ন হইত ॥১০॥ যে ভূপতি রাজধর্ম্মে তৎপর, যে রাজা সম্যকরূপে অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালন-কার্য্যে অভিনিবিষ্ট এবং যে নৃপতি অসীম শৌর্য্যবীর্য্য-

Page 14Permalink

১ম সর্গ ] ইন্দ্রিয় বিজয়। ৩ প্রভাবে শত্রুদিগের নগর জয় করিয়া থাকেন, সেই বিক্রমশালী বিপক্ষবিজয়ী রাজাকে প্রজাকুল প্রজাপতি ব্রহ্মার ন্যায় বিবেচনা করিবে। ফলতঃ বিধাতা যেমন প্রজাবর্গের সৃষ্টি করিয়া ধর্মানুসারে তাহাদের পালন করেন, সেইরূপ রাজাও প্রজাগণের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় প্রজাপতির তুল্য লক্ষিত হন ॥১১॥ রক্ষাকার্য্য রাজার আয়ত্তাধীন। বার্ত্তা (কৃষি প্রভৃতি) রক্ষাকেই অবলম্বন করিয়া বর্ত্তমান থাকে। এই বার্ত্তার বিচ্ছেদ ঘটিলে প্রজা গণ শ্বাস প্রশ্বাস ফেলে বটে কিন্তু জীবিত থাকে না অর্থাৎ বহুবিধ চেষ্টা করিয়াও রক্ষা পায় না। ১১ক॥ পর্য্যন্য অর্থাৎ বর্ষণকারী মেঘের ন্যায় রাজা প্রাণিবর্গের প্রাণধারণের একমাত্র সহায়। পর্য্যন্য বিকল হইলেও লোক বাঁচে কিন্তু রাজা না থাকিলে প্রজা বাঁচে না ॥১১খ॥* রাজা সম্যকরূপে প্রজাদিগকে রক্ষা করিয়া থাকেন। সেই প্রজাকুল রক্ষাগুণে বশীভূত ও কৃতজ্ঞ হইয়া ভূমিপতিকে করদানে এবং অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতাসূচক সম্মানদানে বর্দ্ধিত করিয়া থাকে। এই রক্ষণ ও বর্দ্ধনের মধ্যে বর্দ্ধন অপেক্ষা রক্ষণকার্য্য অধিকতর মঙ্গলজনক। কারণ, রক্ষার অভাব হইলে অর্থাৎ রাজা প্রজারক্ষা না করিলে সদ্বস্তুও অসদ্বস্তু হইয়া থাকে, মঙ্গলও অমঙ্গলরূপে পরিণত হয়, ফলতঃ বিদ্যমান বস্তুও রক্ষণাভাবেন বিনষ্ট হইয়া যায় ॥১২॥ ন্যায়পরায়ণ রাজা নীতিকার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া আপনাকে এবং প্রজা- দিগকেও ধর্ম্মার্থকাম এই ত্রিবর্গদ্বারা সংযোজিত করিয়া থাকেন অর্থাৎ নীতিপরায়ণ রাজাই ত্রিবর্গসাধন করিতে সমর্থ; এবং ত্রিবর্গসাধনক্ষম ভূপতির পদাঙ্কের অনুসরণ করিয়া সমস্ত প্রজাবর্গও ত্রিবর্গসাধন করিতে পারে; কিন্তু রাজা নীতিপথে প্রবৃত্ত না হইলে—রাজা অন্যায়াচরণ- পূর্ব্বক রাজ্যশাসন করিলে, আপনাকে এবং প্রজাদিগকে নিশ্চয়ই বিনষ্ট

  • ১১ক ও ১১খ শ্লোক দুইটি ট্রাভঙ্কুর সংস্করণে অতিরিক্ত আছে
Page 15Permalink

৪ কামন্দকীয় নীতিসার। করেন। নীতিগ্রহণই মঙ্গলের আলয় এবং নীতিবর্জ্জনই ধ্বংসের মূল বলিয়া পরিগণিত ॥১৩॥ যবন নামে এক ভূপতি ধর্ম্মানুসারে প্রজাপালন করিয়া দীর্ঘকাল পৃথিবী উপভোগ করিয়াছিলেন এবং নহুষ রাজা অধর্ম্ম অবলম্বন করিয়া পুনর্ব্বার ধরাতলে নিপতিত হন ॥১৪॥ অতএব পৃথিবীপতি ধর্ম্মকে সম্মুখে রাখিয়া অর্থসাধনের নিমিত্ত যত্নপ্রকাশ করিবেন। ধর্ম্মানুষ্ঠানদ্বারা রাজার রাজ্যের বৃদ্ধি হয় এবং রাজলক্ষ্মী ধর্ম্মেরই সুস্বাদু ফল। ফলতঃ ধর্ম্মানুষ্ঠান না করিলে রাজা কখনও ঐশ্বর্য্যফললাভে সমর্থ হন না ॥১৫॥ রাজা, মন্ত্রী, রাষ্ট্র, দুর্গ, ধন, সৈন্য এবং সুহৃৎ (মিত্রস্বরূপ সামন্ত নৃপগণ)—এই সপ্তাঙ্গ রাজ্য। সত্ত্ব-বুদ্ধিকে (উৎসাহ যুক্ত বুদ্ধিকে) অবলম্বন করিয়া এই রাজ্যের স্থিতি নির্দ্ধারিত হইয়াছে। যে স্থানে সত্ত্বের (উৎসাহের) অধিষ্ঠান, সেই স্থানেই সপ্তাঙ্গ রাজ্যের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে ॥১৬॥ রাজা বুদ্ধিফলে নীতিপথ অবগত হইয়া প্রবল সত্ত্ব (ধৈর্য্য) অবলম্বন পূর্ব্বক অথবা মহৎ উৎসাহ অবলম্বন করিয়া, সর্ব্বদাই আলস্য পরিহার- পূর্ব্বক উদ্যমের সহিত জাগরূক থাকিয়া, এই সপ্তাঙ্গ রাজ্যের লাভের নিমিত্ত যত্নবান্ হইবেন। [ রাজাদের তিনটি শক্তি আছে। প্রভুশক্তি, মন্ত্রশক্তি এবং উৎসাহশক্তি। মন্ত্রশক্তি সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান। কিন্তু মন্ত্রশক্তিসত্ত্বেও অনেক সময়ে উৎসাহশক্তির অভাবে রাজ্যের ধ্বংস হইয়া থাকে। উৎসাহসম্পন্ন ভূপতি কখনও অবসন্ন ও বিষণ্ণ হন না। আলস্য থাকিলে উৎসাহ থাকে না। আলস্য উৎসাহের মহান্ অন্তরায়। পক্ষান্তরে উৎসাহ ও আলস্যের পরম শত্রু। উৎসাহশীল ভূপতির সপ্তাঙ্গ রাজ্যলাভ করিতে কোনই ক্লেশ পাইতে হয় না ] ॥১৭॥ ন্যায়দ্বারা বা নীতিপথের অনুসরণ করিয়া অর্থের উপার্জ্জন; ন্যায়ানুসারে উপার্জ্জিত অর্থের রক্ষণ; ন্যায়পূর্ব্বক অর্জ্জিত ও রক্ষিত অর্থের বর্দ্ধন এবং

Page 16Permalink

১ম সর্গ ] ইন্দ্রিয় বিজয়। ৫ বর্দ্ধিত অর্থ সৎপাত্রে—শ্রোত্রিয়াদি ব্রহ্মনিষ্ঠ উপযুক্ত ব্রাহ্মণাদিপাত্রে—দান ; এই চারিপ্রকার রাজার বৃত্ত বা ব্যবহারকার্য্য। অর্থব্যবহার সম্বন্ধে রাজার এই চারি প্রকার প্রধান কার্য্য অবশ্য কর্ত্তব্য ॥১৮॥ নীতিকুশল, বিক্রমশালী, সতত উদ্যমশীল ভূপাল ঐশ্বর্য্যের বিষয় চিন্তা করিবেন। [ নীতি, বিক্রম ও উদ্যম পরিত্যাগ করিয়া সম্পদের চিন্তা করিলে কোন ফলই হয় না। ঐশ্বর্য্যের মূলে নীতি প্রভৃতি থাকা একান্ত আবশ্যক। ] নীতির মূল বিনয়। বিনয় যে কি, তাহা শাস্ত্রপাঠে জানিতে পারা যায় ॥১৯॥ [ মানবশরীরে চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়গণের দৌরাত্ম্যে এবং আধিপত্যে মানব পশুপ্রকৃতি হইয়া থাকে। এই সকল দুর্দ্ধর্ষ ইন্দ্রিয়দিগকে জয় করা আবশ্যক। ] এই প্রবল ইন্দ্রিয়গণের জয়কেই বিনয় বলে। [ ইন্দ্রিয়জয় না হইলে বিনয় আসিতে পারে না। ] সেই বিনয়যুক্ত মানব শাস্ত্রজ্ঞান ( শাস্ত্রমর্ম্ম ) লাভ করিতে সমর্থ। বিনয়ী না হইলে গুরুপদিষ্ট-শাস্ত্রের অর্থ অবগত হওয়া যায় না। বিনয়ীর নির্ম্মল অন্তঃকরণদর্পণে শাস্ত্রের নিগূঢ় তত্ত্ব প্রতিবিম্বিত হইয়া থাকে। অতএব ইন্দ্রিয়জয়, শাস্ত্রজ্ঞান এবং শাস্ত্রের অর্থের প্রকাশ, এই সকল বিষয়ের মূলীভূত কারণ— একমাত্র বিনয় ॥২০॥ শাস্ত্র শব্দে শাস্ত্রপাঠও শাস্ত্রজ্ঞান ; প্রজ্ঞা শব্দে বুদ্ধিশক্তি ; ধৃতি শব্দে ধৈর্য্য বা সন্তোষ ; প্রগল্‌ভতা শব্দে নির্ভীকতা ; ধারয়িষ্ণুতা শব্দে ধারণ- শীলতা ; উৎসাহ শব্দে উদ্যম ; বাগ্মিতা শব্দে বক্তৃতাশক্তি ; দার্ঢ্য শব্দে মনের দৃঢ়তা ; আপৎক্লেশসহিষ্ণুতাশব্দে বিপদকালে কষ্ট সহ্য করিবার ক্ষমতা ; প্রভাব শব্দে তেজ ; শুচিতা শব্দে পবিত্রতা ; মৈত্রী শব্দে সকল জীবে মিত্রভাব ; ত্যাগ শব্দে দান ; সত্য শব্দে যথার্থ-কথন ; কৃতজ্ঞতা শব্দে পরের উপকার স্মরণ ; কুল শব্দে সৎবংশ ; শীল শব্দে সৎস্বভাব এবং দম শব্দে বাহেন্দ্রিয়দমন—কেহ কেহ মনের দমনকেও দম বলিয়া থাকেন। শাস্ত্র হইতে দম পর্য্যন্ত—এই উনিশটি গুণকে

Page 17Permalink

৬ কামন্দকীয় নীতিসার। সম্পত্তির কারণ বলা হইয়াছে। ফলতঃ শাস্ত্রজ্ঞানাদি থাকিলেই মানব ঐশ্বর্য্যলাভ করিতে সমর্থ হয় ॥২১—২২॥ ভূপতি সর্ব্বাগ্রে নিজে বিনীত হইবেন। আপনাকে বিনয়যুক্ত করিবার পর অমাত্যদিগকে বিনয়সম্পন্ন করিবেন; তৎপরে ভৃত্য- দিগকে বিনয়োপপন্ন করিবেন; অনন্তর আপনার তনয়দিগকে বিনীত করিবেন এবং শেষে প্রজাদিগকে বিনয়ান্বিত করিবেন। [ রাজা স্বয়ং বিনীত না হইয়া অপরকে বিনীত করিবার চেষ্টা করিলে সেই চেষ্টা ফলবতী হয় না। যাহার যে গুণ নাই, তিনি সেই গুণে অপরকে বিভূষিত করিবার জন্য চেষ্টা করিলে অথবা উপদেশ দিলে অবশ্যই তিনি জনসমাজে হাস্যাস্পদ হন ] ॥২৩॥ যাঁহার প্রজাবর্গ সর্ব্বদা অনুরক্ত, যিনি প্রজাপালনে আসক্ত এবং স্বয়ং বিনীত, সেই ভূপতিই বহুতর ঐশ্বর্য্য ভোগ করিয়া থাকেন। ফলতঃ সর্ব্বদা প্রজাপুঞ্জের আনুরক্তি, প্রজাপালনে আসক্তি এবং নিজের বিনয়,—এই তিনটি ঐশ্বর্য্যভোগের কারণ বলিয়া প্রসিদ্ধ ॥২৪॥ হস্তী যেমন অরণ্যে বিচরণ করিয়া থাকে এবং সেই প্রবল হস্তীকে নিগৃহীত করিতে পারা যায় না, সেইরূপ নেত্রকর্ণাদি ইন্দ্রিয়রূপ মত্ত- মাতঙ্গ বিস্তীর্ণ—রূপ-রসাদি স্বরূপ ভীষণ বিষয়ারণ্যে ইতস্ততঃ বিচরণ করিয়া থাকে, এই প্রবল ইন্দ্রিয়-হস্তী সর্ব্বদাই অনিষ্টসাধন করিতেছে, কেহ ইহাকে নিগ্রহ করিতে পারে না। রাজা এইরূপ বিষয়বনে বিচরণ- কারী প্রমাথী বা অনিষ্টকারী ইন্দ্রিয়রূপ-বন্য-মত্তহস্তীকে জ্ঞানরূপ অঙ্কুশ- দ্বারা বশীভূত করিবেন। যেরূপ অঙ্কুশদ্বারা হস্তী বশীভূত হয়, তদ্রূপ জ্ঞানদ্বারা প্রবল ইন্দ্রিয় দমন হয় ॥২৫॥ প্রথমে আত্মা বা জীবাত্মা শব্দস্পর্শাদিরূপ বিষয়ভোগ করিবার জন্য সযত্নে অন্তঃকরণে অধিষ্ঠান করিয়া থাকে। এই আত্মা ও মনের সংযোগেই মানবের শুভাশুভ কার্য্যে প্রবৃত্তি জন্মে ॥২৬॥ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ,

Page 18Permalink

১ম সর্গ ] ইন্দ্রিয় বিজয়। ৭ এই পাঁচটি বিষয়, আমিষ বা লোভনীয় বস্তুর তুল্য। এই বিষয়রূপ আমিষের লোভে মন ইন্দ্রিয়দিগকে চালনা করে। কর্ণ শব্দ, ত্বক্ স্পর্শ, নেত্র রূপ, জিহ্বা রস এবং নাসিকা গন্ধকে গ্রহণ করিবার জন্য দিবারাত্র ধাবমান হইতেছে। এই বিষয়গ্রহণে ইন্দ্রিয়গণের বিরাম নাই। এই দুর্দ্দম- ইন্দ্রিয়দিগকে যত্নপূর্ব্বক নিরোধ বা দমন করিবে। ঐ ইন্দ্রিয়দিগকে জয় করিতে পারিলে মানব জিতেন্দ্রিয় হয় ॥২৭॥ বিজ্ঞান, হৃদয়, চিত্ত, মন ও বুদ্ধি—ইহারা এক পর্যায়বাচক শব্দ; ইহারা সকলেই সমান। এই জগতে আত্মা এই বিজ্ঞানাদিদ্বারা জীবকে কার্য্যে লওয়াইয়া থাকে। জীবের এইরূপে কার্য্যে প্রবৃত্তি এবং কার্য্যে নিবৃত্তি অহরহঃ সম্পাদিত হইতেছে ॥২৮॥ ধর্ম্ম, অধর্ম্ম, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ এবং তদ্রূপ প্রযত্ন, জ্ঞান ও সংস্কার, —এইগুলি আত্মচিহ্ন। এই সকল চিহ্ন দ্বারা আত্মনিরূপণ হয় ॥২৯॥ জ্ঞানের অয়ৌগপদ্য অর্থাৎ ক্রমবিকাশ, মনের লিঙ্গ বা চিহ্ন বলিয়া উল্লেখিত হইয়াছে। এককালে সকল বস্তুর জ্ঞান হয় না; ঘটজ্ঞান কালে পটজ্ঞানের উদয় হয় না। ভিন্ন ভিন্ন কালে ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানের উদয় হয়। এইরূপ জ্ঞানের এককালীন উদয় না হওয়াই মনের চিহ্ন অর্থাৎ জ্ঞানের এইরূপ অযৌগপদ্য দেখিয়া পণ্ডিতগণ মন নিরূপণ করেন। এবং নানাবিধ কার্য্যে বা নানাবিধ-বিষয়ে মনের যে সঙ্কল্প, তাহাকেই মনের কর্ম্ম বলা হইয়াছে ॥৩০॥ ইন্দ্রিয় দুই প্রকার। জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কর্ম্মেন্দ্রিয়। কর্ণ, ত্বক, চক্ষু, জিহ্বা এবং নাসিকা লইয়া পাঁচ;—এই পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়। পায়ু (গুহ্যদ্বার), উপস্থ (লিঙ্গ), হস্ত, পাদ এবং বাক্য—এই পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয়। এইরূপে দশটি ইন্দ্রিয় হইল ॥৩১॥ কর্ণের শব্দ, ত্বকের স্পর্শ, চক্ষুর রূপ, জিহ্বার রস এবং নাসিকার গন্ধ গ্রহণ, এই পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের ক্রিয়া। পায়ুর উৎসর্গ বা মলনিঃসরণক্রিয়া, উপস্থের (লিঙ্গের) আনন্দ-

Page 19Permalink

৮ কামন্দকীয় নীতিসার। ক্রিয়া,১ হস্তের আদান বা গ্রহণক্রিয়া, পাদের গতি বা গমনক্রিয়া এবং বাক্যের আলাপ বা কথনক্রিয়া; ইন্দ্রিয়বর্গের যথাক্রমে ক্রিয়াসকল হয় ॥৩২॥ আত্মজ্ঞ ও মনস্তত্ত্ববিৎ মনীষিগণ, আত্মা এবং মনকে অন্তঃকরণ বলিয়া থাকেন। এই আত্মা (জীবাত্মা) এবং মন উভয়ের যত্ন হইতে সঙ্কল্প উৎপন্ন হয়। ফলতঃ আত্ম-মনের প্রযত্ন বা চেষ্টার নামই সঙ্কল্প। এই উভয়ের চেষ্টা না হইলে সঙ্কল্প হইতে পারে না ॥৩৩॥ আত্মা (শরীর), বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়বর্গ এবং শব্দাদি বিষয়সমূহই বাহ্যেন্দ্রিয়। সঙ্কল্প এবং অধ্যবসায়দ্বারা এই বাহ্যেন্দ্রিয়ের সিদ্ধি নির্ণীত হয় ॥৩৪॥ বাহ্যেন্দ্রিয় ও অন্তরেন্দ্রিয় এই দুইটি বাহ্যিক ও আন্তরিক যত্নের কারণ বলিয়া জানিবে। অতএব প্রবৃত্তির নিরোধ করিয়া অর্থাৎ এই সকল ইন্দ্রিয়ের প্রবৃত্তি-দমন করিয়া, মনের লয় চিন্তা করিবে। ইহার তাৎপর্য্য এই—প্রবৃত্তিই মনের কার্য্য, প্রবৃত্তি থাকিলেই মনের অস্তিত্ব থাকে; প্রবৃত্তির নিরোধ করিলে মনের অস্তিত্ব থাকে না। প্রবৃত্তিশূন্য-মন মনই নহে, তখন মনের লয় হইয়াছে বুঝিতে হইবে ॥৩৫॥ এইরূপে নীতি এবং অপনীতি বা অনীতিবেত্তা ভূপতি ইন্দ্রিয়গণের সাহায্যে আপনি আত্মসংযম করিয়া, আপনার হিতানুষ্ঠান করিবেন। —অর্থাৎ আত্মদমন ব্যতিরেকে আত্মহিত হইতে পারে না ॥৩৬॥ যে রাজা নিজের একটিমাত্র ক্ষুদ্র মনেরই দমনে অসমর্থ, তিনি কিরূপে সাগরমেখলা- পরিবেষ্টিতা এই বিস্তীর্ণা বসুন্ধরা জয় করিতে সমর্থ হইবেন? ॥৩৭॥ চিত্ত অপহরণকারী শব্দস্পর্শাদি বিষয় সকল ভোগাবসানে বিরস হয়। বিষয়সেবী রাজা হস্তীর ন্যায় হৃদয়ে খেদপ্রাপ্ত হইয়া পরিণামে দুর্দশাগ্রস্ত হন ॥৩৮॥ যে ভূপতি নীতিবিরুদ্ধ সমস্ত অকার্য্যে আসক্ত, শব্দস্পর্শাদি বিষয় দ্বারা যাহার দুই চক্ষু অন্ধ হইয়াছে, সেই অকার্য্যপরায়ণ বিষয়ান্ধ রাজা, নিজেই অতি ভয়ঙ্কর বিপদে পতিত হন ॥৩৯॥

Page 20Permalink

১ম সর্গ ] ইন্দ্রিয় বিজয়। ৯ শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ,—এই পাঁচটি বিষয়। এই পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে এক একটি বিষয়ই বিনাশসাধনে সমর্থ। কেবল শব্দ, কি কেবল স্পর্শ, কেবল রূপ, কেবল রস, অথবা কেবল গন্ধ, মানবকে প্রলুব্ধ করিয়া বিনাশ করে। অতএব যদি পাঁচটি বিষয় একত্র মিলিত হইয়া স্ব স্ব কার্য্য করিতে উদ্যত হয়, তাহা হইলে তখন কিরূপ যে অনিষ্ট ও বিপদ্ ঘটে, তাহা কল্পনারও অতীত—চিন্তারও অতীত ॥৪০॥ প্রথমে শব্দের বিষয় কথিত হইতেছে। হরিণ পবিত্র ঘাসের অঙ্কুর ভক্ষণ করিয়া থাকে এবং সে অতি দূর দেশে বিচরণ করিতে সমর্থ; সুতরাং তাহার প্রাণবধের আশঙ্কাও সামান্য; তথাপি সে ব্যাধের বংশীধ্বনি শুনিলে উহার লোভে নিজের মৃত্যু খুঁজিয়া লয়। অর্থাৎ বাঁশার রবে মুগ্ধ মৃগকে ব্যাধ অনায়াসেই বধ করে। ইহাই শব্দ-বিষয় সেবনের পরিণাম ॥৪১॥ পর্ব্বতের ন্যায় দীর্ঘাকার অবলীলাক্রমে বৃক্ষ উৎপাটনে সমর্থ হস্তীও (মানুষের শিক্ষিত মোহিনী) হস্তিনীর স্পর্শ-মোহে বন্ধন প্রাপ্ত হয়। ইহাই স্পর্শ-বিষয়ের সামর্থ্য ॥৪২॥ স্নিগ্ধ দীপশিখার আলোক দর্শনে মোহিত পতঙ্গ অগ্নিশিখায় নিঃসন্দেহে সহসা পতিত হয় ও মরিয়া যায়। ইহা রূপবিষয়ের শক্তি ॥৪৩॥ মৎস্য যেখানে থাকে, সেখানে কাহারও চক্ষু যায় না; এই মৎস্য অগাধ জলে বিচরণ করে, দৃষ্টির অগোচরে থাকিলেও অতল-স্পর্শ সলিলে সন্তরণ করিলেও এই মূঢ়মতি মীন মৃত্যুর জন্য টোপযুক্ত বঁড়শী আস্বাদন করে, ইহাই রসবিষয়ের সামর্থ্য ॥৪৪॥ মত্ত হস্তীর মাথা ও শুঁড় হইতে যে জল পড়ে, তাহার নাম দান; উহাতে মদের ন্যায় উৎকট গন্ধ আছে। হস্তী দানবারি নিঃসরণ কালে দুইটি কান চালিতে থাকে, তাহাতে ঝল্ঝল্ শব্দ উঠে। মধুকর ঐ মদ-জলের গন্ধে লুব্ধ হইয়া উহার পানেচ্ছায় অশ্বগ-সঞ্চরণ-যোগ্য গজকর্ণের ঝল্ঝল্ শব্দের নিকট যাইয়া শেষে কাণের ঝাপটে মারা যায়। ইহাই গন্ধ বিষয়ের পরিণাম ॥৪৫॥ শব্দ প্রভৃতি এক একটি বিষয় বিষতুল্য। বিষতুল্য এক একটি বিষয়